ইরানের ওপর সামরিক হামলা স্থগিত করা ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু হওয়া নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চরম বাদানুবাদ ও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটন থেকে ইরানের সাথে আলোচনা চলমান থাকার কথা জানিয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, অন্যদিকে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি কোনো ধরনের আলোচনার দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে।
২ আগস্ট (রবিবার): ট্রাম্পের আক্রমণ স্থগিতের ঘোষণা
গত ২ আগস্ট, ২০২৬ (রবিবার) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান যে, তিনি ইরানের ওপর "দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় আক্রমণের" চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং কিছু আঞ্চলিক নেতার অনুরোধে এবং কূটনীতিকে শেষ একটি সুযোগ দিতে তিনি নির্ধারিত হামলা বাতিল বা স্থগিত করেছেন।
৩ আগস্ট (সোমবার): ওভাল অফিসে ট্রাম্পের বক্তব্য ও চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি
পরদিন ৩ আগস্ট, ২০২৬ (সোমবার) ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, "আমরা এই মুহূর্তে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি।"
তেহরানকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন:
"আমি তাদেরকে চুক্তি করার জন্য শেষ সুযোগ দিতে চাই। আক্রমণ চালানোর আগে এটি তাদের জন্য শেষ সুযোগ (last chance before decapitation)। আশা করি তারা তাদের ভাবনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।"
একই দিনে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল (Truth Social)-এ একটি বার্তা পোস্ট করে ইরানি নেতৃত্বকে "অবিশ্বাস্যভাবে ছলনাকারী" (unbelievably duplicitous) বলে উল্লেখ করেন। তিনি লেখেন:
"ইরান স্বীকার করুক বা না করুক, তারা যে সংকট তৈরি করেছে আমরা তা সমাধানের জন্যই কথা বলছি। হয় একটি নতুন চুক্তি হতে হবে, না হয় তাদের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ (Total Surrender) করতে হবে—তা না হলে যুক্তরাষ্ট্র কিছুই পার হতে দেবে না।"
৩ আগস্ট (সোমবার): ইরানের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান
ট্রাম্পের আলোচনার দাবি প্রকাশের পরপরই ৩ আগস্ট, ২০২৬ (সোমবার) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই (Esmaeil Baqaei) এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দেন।
ইসমাইল বাঘাই স্পষ্ট করে বলেন:
"যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের এই মুহূর্তে কোনো ধরনের আলোচনা বা বৈঠক হচ্ছে না এবং আগামী দিনগুলোতেও এমন কোনো পরিকল্পনা নেই। আমাদের একমাত্র আলোচনা চলছে ওমানের সাথে, যা হরমুজ প্রণালীর নিরাপদ নৌপথ সংক্রান্ত।"
[Ad Placement - Middle of Article]
তিনি আরও যোগ করেন যে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে হরমুজ প্রণালীর যে স্থিতি ছিল, প্রণালীটি আর কখনোই সেই আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না।
একই দিন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি (Abbas Araghchi) জানান, ওমানের মাধ্যমে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং তা কেবল হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজের নতুন নিরাপদ পথ নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
দুই দেশের মূল লক্ষ্য ও চাওয়া
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্র যা চাচ্ছে:
১. হরমুজ প্রণালী অবিলম্বে সব ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ও জ্বালানিবাহী জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করা।
২. ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ (Denuclearization) করা এবং আঞ্চলিক প্রভাব হ্রাস করা।
৩. যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব শর্তাধীনে নতুন একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা অথবা ইরানের কাছে 'সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ' আদায় করা।
ইরান যা চাচ্ছে:
১. যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক আলোচনায় না গিয়ে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারী দেশ ওমানের মাধ্যমে নিরাপত্তা বজায় রাখা।
২. হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকার ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৩. মার্কিন সামরিক চাপ বা ব্ল্যাকমেইলের মুখে নতি স্বীকার না করে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা।