ঢাকা: রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগের পরপরই সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে ঘিরে শুরু হয়েছে নজিরবিহীন আইনি ও রাজনৈতিক তোলপাড়। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর তদন্ত প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ ও শেয়ার জালিয়াতিতে তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে। পদত্যাগের মাধ্যমে সাংবিধানিক সুরক্ষার বলয় থেকে বের হয়ে আসায় এখন তাঁকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার ও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে দেশের একাধিক বড় রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ।
জেএমসি বিল্ডার্স ও ৮০ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারি
হাইকোর্টে দাখিল করা বিএফআইইউ-এর বিশেষ তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত 'জেএমসি বিল্ডার্স' নামক প্রতিষ্ঠানের আড়ালে পরিচালিত হয়েছে এই বিশাল আর্থিক অনিয়ম। আদালতের আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, ২০১৭ সাল থেকে শুরু করে ২০২৩ সালে বাংলাদেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সাহাবুদ্দিন চুপ্পু 'জেএমসি বিল্ডার্স'-এর মনোনীত প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের পরিচালনা পর্ষদে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
বিএফআইইউ প্রতিবেদনে উঠে আসা মূল অভিযোগসমূহ:
নিয়ম লঙ্ঘন: ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী একক কোনো গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠান ১০ শতাংশের বেশি শেয়ারের মালিক হতে না পারলেও জালিয়াতির মাধ্যমে ২৪টি ভুয়া কোম্পানির নামে ৮১.৯২% শেয়ার হস্তান্তর করা হয়।
অর্থ উত্তোলন: শেয়ার দখলের পর উল্লিখিত সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ উত্তোলন করা হয়েছে।
জেএমসি বিল্ডার্সের ভূমিকা: মোট উত্তোলিত অর্থের মধ্যে কেবল সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর প্রতিনিধিত্ব করা 'জেএমসি বিল্ডার্স'-এর আড়ালেই ব্যাংকটি থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা।
অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি রাজনৈতিক দলগুলোর
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সাবেক এই রাষ্ট্রপতিকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, অসুস্থতার দোহাই দিয়ে পদত্যাগ করা বস্তুত কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়; বরং এটি একটি কৌশলগত 'সেফ এক্সিট' বা আইনি বিচার এড়িয়ে নিরাপদে সটে পড়ার চক্রান্ত, যা দেশবাসী মেনে নেবে না।
একই ধরনের কঠোর প্রতিক্রিয়া এসেছে ইনকিলাব মঞ্চ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন থেকে। তাদের দাবি, পদত্যাগের সাথে সাথেই তাঁর সমস্ত প্রশাসনিক অনুকম্পা ও দায়মুক্তি বাতিল ঘোষণা করতে হবে এবং আর্থিক খাতের এই অভূতপূর্ব লুটের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
সাংবিধানিক দায়মুক্তি ও আইনি সমীকরণ
[Ad Placement - Middle of Article]
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকাকালে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো প্রকার ফৌজদারি মামলা দায়ের, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি কিংবা আদালতের সমন পাঠানোর সুযোগ থাকে না। কিন্তু পদত্যাগের সাথে সাথেই সেই সাংবিধানিক সুরক্ষার মেয়াদ চূড়ান্তভাবে সমাপ্ত হয়।
আইনি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পদত্যাগের পর সাংবিধানিক সুরক্ষা আর কার্যকর থাকে না। ফলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তদন্তের ভিত্তিতে একজন সাধারণ নাগরিকের মতোই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও আইনি বিচার প্রক্রিয়া চালানোর পূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালীন নেওয়া আনুষ্ঠানিক সরকারি কার্যাবলীর ক্ষেত্রে কতটা দায়মুক্তি বহাল থাকবে, তা নিয়ে আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্ক এখনো অব্যাহত রয়েছে।
আদালতের আগের নিষেধাজ্ঞা ও পরবর্তী পদক্ষেপ
উল্লেখ্য, জালিয়াতির এ বিষয়ের গভীরতা বিবেচনায় হাইকোর্ট আগেই সম্পর্কিত সাবেক পরিচালকদের বিদেশযাত্রায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং জেএমসি বিল্ডার্সের মালিকানাধীন শেয়ার হস্তান্তর স্থগিত করার স্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছিল।
অভিযোগ অস্বীকার সাবেক রাষ্ট্রপতির
অন্যদিকে, তাঁর বিরুদ্ধে আনা সমস্ত আর্থিক অনিয়ম, ব্যাংক জালিয়াতি এবং বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার গুঞ্জনকে 'সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাল্পনিক রটনা' বলে দাবি করেছেন সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। তাঁর মতে, রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই এই ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
দৃষ্টি এখন হাইকোর্টের শুনানিতে
সমগ্র দেশের নজর এখন উচ্চ আদালতের দিকে। আগামী বুধবার বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে বিএফআইইউ-এর পেশ করা চাঞ্চল্যকর রিপোর্টের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আইনি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই শুনানির ফলাফলের ওপর কেবল দেশের বৃহত্তম ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির গতিপ্রকৃতিই নির্ভর করছে না, বরং তা সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতির আইনি ও রাজনৈতিক পরিণতিও নির্ধারণ করে দেবে।